Beautiful Bangladesh
১) মহেশখালী
মহেশখালী জেটি।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম পর্যটন এলাকা কক্সবাজারের অদূরেই মহেশখালী দ্বীপ। কক্সবাজার সদর হতে কস্তুরা ঘাট, ৬নং ঘাট বা উত্তর নুনিয়া ছড়া সরকারি জেটিঘাট থেকে মহেশখালী যাবার জন্য রয়েছে স্থানীয় ইঞ্জিনের নৌকা আর স্পিডবোট। হাতে বেশি সময় থাকলে ইঞ্জিনের নৌকায় করে যাওয়াই ভালো। এতে উপভোগ করতে পারবেন সমুদ্রের মোহনা আর মহেশখালী চ্যানেল। জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে মহেশখালী পৌঁছাতে। তবে স্পিডবোটে গেলে ১৫ থেকে ২০ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায়।
আদিনাথ পাহাড়ের উপরে অবস্থিত মন্দির।
দ্বীপের ভিতরে রিকশা দিয়ে যাতায়াতের সু-ব্যবস্থা আছে। মহেশখালীতে দেখা যাবে আদিনাথ পাহাড়, যে পাহাড়ের উপরে রয়েছে আদিনাথ মন্দির। মন্দির অতিক্রম করে পাহাড়ের উপরে উঠলে চোখে পড়বে অদূরে বাঁকখালী নদীর অবর্ণনীয় সৌন্দর্য। এছাড়া রয়েছে বড় রাখাইন পাড়ায় বৌদ্ধ মন্দির। মন্দির পরিদর্শন করে রাখাইন পাড়ায় কিছু সময় কাটাতে পারেন স্থানীয় রাখাইনদের সঙ্গে। চাইলে স্বল্প মূল্যে কিনতে পারেন রাখাইনদের তৈরি কাপড়, গামছা, শাল বা বিছানার চাদর। মহেশখালীতে রয়েছে প্রচুর নারকেল গাছ। ফলে অল্প দামেেই মেলে ডাব। তবে মহেশখালী গেলে এখানকার বিখ্যাত মিষ্টি পান খেতে ভুলবেন না। এই দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষের পেশা মাছ ধরা তাই শুঁটকির জন্যও মহেশখালী বিখ্যাত।
মহেশখালীতে কতক্ষণ থাকবেন এবং কোথায় ঘুরবেন তার উপর নির্ভর করে রিকশা ভাড়া করলে অবশ্যই আগে থেকেই ভাড়া ঠিক করে নিতে হবে।
২) সোনাদিয়া দ্বীপ
সোনাদিয়া দ্বীপে যেতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা।
সোনাদিয়া কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীব-বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ একটি অনন্য দ্বীপ। জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নে সোনাদিয়া অবস্থিত। একটি খাল দিয়ে সোনাদিয়া মহেশখালী মূল দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন। দ্বীপটির আয়তন মাত্র ৭ বর্গ কিলোমিটার। কক্সবাজার সদর হতে কস্তুরা ঘাট, ৬নং ঘাট বা উত্তর নুনিয়া ছড়া সরকারি জেটিঘাট হতে স্পিডবোটে বা কাঠের নৌকায় করে সোনাদিয়া যাওয়া যায়।
সোনাদিয়া দ্বীপে ক্যাম্পিং।
সোনাদিয়ায় রয়েছে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, সৈকত ঘেষে সারিবদ্ধ সুউচ্চ বালিয়াড়ি, জালের মতো অসংখ্য ছোট-বড় খাল পরিবেষ্টিত ম্যানগ্রোভ বন, পলি বিধৌত বিস্তীর্ণ ভূমি, কেয়া-নিশিন্দার ঝোপ। এছাড়া বিচিত্র প্রজাতির জলচর পাখিও সোনাদিয়া দ্বীপের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এখানে সামুদ্রিক সবুজ কাছিমও ডিম পাড়তে আসে। সোনাদিয়ার সৈকত এবং বালিয়াড়ি বিপন্ন জলপাই বর্ণের সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার উপযোগী স্থান।
এছাড়া সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনারা ঘেঁষে বিচরণ করে লাল কাঁকড়া। মাছ শিকার, মাছ শুকানো এবং কৃষিকাজ এই দ্বীপবাসীর মূল পেশা। শীতকালে সোনাদিয়া দ্বীপে নানা ধরনের স্থানীয় ও পরিযায়ী জলচর পাখির আগমন ঘটে। এখানে পর্যটকদের থাকার মতো হোটেল এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তবে ক্যাম্প করার জন্য আকর্ষণীয় ও আদর্শ জায়গা সোনাদিয়া দ্বীপ। প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই ও দরকারি জিনিষপত্র এবং তাবু নিয়ে নির্বিঘ্নে প্রকৃতির কোলে কাটাতে চাইলে চলে যেতে পারেন সোনাদিয়া দ্বীপে।
৩) কুতুবদিয়া
কুতুবদিয়া দ্বীপে মাছ শিকারের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
কুতুবদিয়া একটি দ্বীপ, যা কুতুবদিয়া চ্যানেল দ্বারা মূল ভূ-খণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। দীর্ঘদিন ধরে কুতুবদিয়া দ্বীপের গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলেও এ দ্বীপ সমুদ্রবক্ষ থেকে জেগে উঠতে শুরু করে চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে। ধারণা করা হয়, পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এ দ্বীপে মানুষের পদচারণা শুরু হয়। কুতুবদিয়ার বিস্তৃত সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম। এর সৌন্দর্য পর্যটকদের মন হরণের জন্য যথেষ্ট।
কুতুবদিয়া দ্বীপে বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
কুতুবদিয়ায় বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতাও হতে পারে আপনার জীবনের এক অনন্য স্মৃতি। এখানে রয়েছে একটি বাতিঘর যা রাতের অন্ধকারে জাহাজের নাবিকদের পথ দেখায়। এছাড়া এখানে রয়েছে লবনের কারখানা।
কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন এলাকা। প্রতি বছর লাখো পর্যটকের আগমন ঘটে ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতে, যা বিশ্বের দীর্ঘতমও বটে।
৪) উখিয়া
কক্সবাজার সদর থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরের জনপদ উখিয়া। এক প্রান্তে বাংলাদেশ-মায়ানমারকে বিভক্তকারী নাফ নদী, অন্য দিকে বঙ্গোপসাগর। একসময় গভীর জঙ্গলে পূর্ণ ছিল উখিয়া। এখনও কিছু দুগর্ম পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রায়ই বন্যহাতি হানা দেয় লোকালয়ে। হরিণের কথা কলা হলেও বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। এখানকার ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক গোষ্ঠী রাখাইনদের জীবনাচার পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
উখিয়ার অন্যতম আকর্ষণ ইনানী সৈকত। শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণের এ সৈকতটি হচ্ছে কক্সবাজার পর্যটনের ইমাজিং টাইগার। জেলা শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ ১২০কিলোমিটার সৈকতের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর, আকর্ষণীয় ও নয়নাভিরাম ইনানী। সৈতক জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট বড় অসংখ্য প্রবাল, মৃত কোরালের উপরে বালি ও কাদা জমে সৃষ্টি করেছে বাড়তি সৌন্দর্যের।
৫) ইনানী বীচ।
ভালো সময় কাটানোর জন্যে হতে পারে এটি আপনার অন্যতম পর্যটন গন্তব্য। বন বিভাগের একটি মনোমুগ্ধকর রেস্ট হাউস রয়েছে, নতুন ভাবে গড়ে উঠেছে অনেক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট। সিনেমা ও নাটকের শুটিংস্পট হিসেবেও নজর কাড়ছে ইনানী। এ সৈকত ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা পিকনিক স্পটও।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চিংড়ি পোনা উৎপাদনের অনেক হ্যাচারি এবং কুমিরের খামারও রয়েছে উখিয়াতে। পথের ধারে সারি সারি সুপারি গাছ বাড়িয়ে দিয়েছে এ জনপদের সৌন্দর্য। একপাশে সবুজ বন-পাহাড় আর আরেক পাশের সমুদ্র, এর মাঝেই চলে গেছে মেরিন ড্রাইভওয়ে। গাড়িতে, মোটর বাইক বা সাইকেলে যেতে পারেন মেরিন ড্রাইভওয়েতে। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে টেকনাফ পৌঁছে যাওয়া যায়, যেভাবেই যান না কেন স্মৃতির ঝুলিতে এক অনন্য অভিজ্ঞতা জমা হবে নিঃসন্দেহে।
৬) মেরিন ড্রাইভওয়ে।
উখিয়া সদরে রয়েছে পাতাবাড়ী বৌদ্ধ বিহার। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পূণ্যস্থান। প্রায় ২০০ বছর আগে বিহারটি স্থাপিত হয়েছিল বলে স্থানীয়দের ধারণা। এছাড়া উপজেলার জালিয়াপালং ইউনিয়নের পাটুয়ারটেক সৈকতের কাছে নিদানিয়া পাহাড়ের ভেতরে রয়েছে সুড়ঙ্গ গর্তের সমাহার কানারাজার গুহা।
প্রায় ১৪ ফুট উঁচু ও ১০ ফুট বেড়’র সুড়ঙ্গটির প্রবেশ মুখ থেকে সোজা ১২০-১৫০ ফুট দূরত্বের, দুই দিকে দু’টো দরজা রয়েছে। আছে একটি করে বিশাল কক্ষও।
ইতিহাস বলে, অতীতে টেকনাফ-উখিয়া এলাকাটি শাসন করতো রাখাইন রাজরা। এক রাখাইনরাজ (এক চোখ অন্ধ) আত্মরক্ষার্থে এখানে একটি গুহা নির্মাণ করেছিলেন বলে কথিত আছে। গুহার অভ্যন্তরে প্রচুর ধন রত্ন আছে বলে স্থানীয়রা এটিকে আন্ধার মানিক বলেও ডাকেন।
সুড়ঙ্গ পথে শুষ্ক মৌসুমে একটি ট্রাক অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। তবে বর্ষা মৌসুমে বিষাক্ত সাপ আর নাম না জানা জীবজন্তুর ভয় তো রয়েই যায়। তবে বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে কানা রাজার গুহার মুখ বন্ধ রয়েছে।
৭) ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাতি।
বর্তমান নাম ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাফারি পার্ক। জেলা শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার উত্তরে ও চকরিয়া উপজেলা থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে,কক্সবাজার জেলা দক্ষিণ বন বিভাগের ফাসিয়াখালি রেঞ্জের ডুলাহাজারা ব্লকে এর অবস্থান। মূলত হরিণ প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে ১৯৯৯ সালে এ পার্ক প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়।
বিলুপ্তপ্রায় ও বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বংশবৃদ্ধিসহ মানুষের চিত্ত-বিনোদন, গবেষণার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন চকরিয়া উপজেলায় স্থাপিত এ সাফারি পার্ক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় স্থান। হরিণ প্রজনন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমানে এখানে বাঘ, সিংহ, হাতি, ভালুক, গয়াল, কুমির, জলহস্তী, মায়া হরিণ, সাম্বার হরিণ, চিত্রা হরিণ, প্যারা হরিণও রয়েছে। এই পার্কে স্বাদুপানির কুমির যেমন আছে, তেমনি রয়েছে লোনা পানির কুমিরও।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রবেশদ্বার।
পার্কে ঢুকতে প্রতি দর্শনার্থীর জন্যে ১০ টাকা মূল্যের টিকিট কিনতে হবে। ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য প্রবেশ ফি ৫ টাকা। ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা সফরের জন্যে দু’টি প্যাকেজ রয়েছে। ৩০ থেকে ১০০ জনের গ্রুপকে দিতে হয় ১০০টাকা প্রবেশ ফি। আর ১০০জনের বেশি শিক্ষার্থীদের গ্রুপের জন্য প্রবেশ ফি ২০০টাকা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫ ডলার বা সমপরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রা।
৮) রামু
বৌদ্ধ বিহারের বা মন্দিরের জন্যে বিখ্যাত রামু। এখানে রয়েছে ছোট বড় অনেক বৌদ্ধ মন্দির। রাজারকুল এলাকায় পাহাড়চুড়ায় রামকোট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার মন্দিরটি অবস্থিত। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ৩০৮ খ্রীষ্ট পূর্বে সম্রাট অশোক এটি নির্মাণ করেন। এর অভ্যন্তরে ২ টি বড় বুদ্ধ মুর্তি আছে। একটিতে গৌতম বুদ্ধ এর বক্ষাস্থি স্থাপিত হয়েছে।
রামুতে অবস্থিত বৌদ্ধ মন্দির ।
রামুতে রয়েছে ২০০ একরের বেশি জায়গার নিারকেল বাগান। বলঅ হয়ে থাকে এটিই দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম নারিকেল বাগান। রামু মরিচ্যা সড়ক ধরে দক্ষিণে আধা কিলোমিটারের মধ্যে এর অবস্থান। ১৯৮১-১৯৮২ সালের দিকে মাত্র ৩৪ টি চারা রোপণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয় এ বাগানের।
রামুর নারিকেল বাগান।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে রামুর রাবার বাগান। উপজেলার চৌমুহনী স্টেশন থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার উত্তরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশ ধরে এগোলেই চোখে পড়বে অসংখ্য রাবার বাগানের।
কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থান বলতে আমরা বিশেষত সমুদ্র সৈকত ও পরিচিত আরও কয়েকটি জায়গাকেই বুঝি। কিন্তু এর বাইরেও কক্সবাজারে রয়েছে সময় কাটানো ও উপভোগ করার মতো অনিন্দ্য সুন্দর কিছু জায়গা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন